” ঘড়া ” একটি জ্বীন এর গল্প ( পর্ব ১০ )

/” ঘড়া ” একটি জ্বীন এর গল্প ( পর্ব ১০ )

” ঘড়া ” একটি জ্বীন এর গল্প ( পর্ব ১০ )

রী বিষয়ক মণ্ত্রিকে সঙ্গে করে আবার ফিরে এসেছি ভোজসভায়। আমার ও পরী মণ্ত্রির চেহারার সাদৃশ্যের ব্যাখ্যা দেওয়া জরুরী হয়ে পড়েছে।
আসলে ব্যাখ্যা দেওয়ার কিছুই নেই।দুটি মানুষের চেহারা এক রকম হতেই পারে। তারপরও কিছু একটা বলতে হবে বলেই মুখ খুললাম।
-‘ সুলতানা আব্রাহামের সাথে আমার চেহারার মিলটা কাকতলীয়। এগার জন মানুষের চেহারা প্রায় অথবা হুবহু এক রকম হয় … এই মতবাদের প্রমানই বোধ হয় আমার আর সুলতানা আব্রাহামের চেহারার মিল…’
নিজের যুক্তি নিজের কাছেই দুর্বল মনে হল কিন্তু সুলতানা আব্রাহামের সমর্থনে বক্তব্যটা বলিষ্ঠতা পেলো।
সবাই মেনে নিল মনে হচ্ছে । আসলে সবাই এখন স্ফটিক সাদা পরমান্নে মনোযোগী, শুধু রশিদ মৃধার মধ্যে একটু অসন্তোষ টের পেলাম।
-‘কিন্তু হুবহু এক রকম! কি করে হয়, আর ব্যাপারটা এত পরে ধরা পড়লো কেন!’

-‘ এত মানুষের ভীড়ে চোখে পরে নাই তোমার। দেখো না আমিও তো বুঝতে পারি নাই!’
মৃধাকে উদ্দেশ্য করে ফৌজী তার মতামত দিল।
বিনা দ্বিধায় মৃধা মেনে নিল।
মৃধা ফৌজীর একনিষ্ঠ ভক্ত। ফৌজী যদি ঘোর অমাবশ্যার রাতে চাঁদ দেখে তাহলে মৃধা বলবে, ‘ওস্তাদ যখন দেখেছেন তাহলে অবশ্যই অমাবশ্যায় চাঁদ ওঠে । ‘
পরিস্থিতি আয়ত্তের মধ্যে দেখে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম।

শাশুড়িকে জানানো দরকার যে মতিবিবিকে ওনার তদারকির জন্য ওনার কাছে পাঠাচ্ছি ।
-‘আগামিকাল থেকে মতিবিবি আপনার ওখানে জয়েন করছে । আপনার এখন লোকবলের প্রয়োজন।’
-‘আমি জানি, কিন্তু মতিবিবি বেশ আক্ষেপ করছিলো।’
শাশুড়ীর মুখে মিটি মিটি হাসি।
-‘কেন আক্ষেপ করছিলো?’
-‘মতিবিবির ধারনা, মতিবিবির রান্না ছাড়া অন্য কারো রান্না ফৌজীর মুখে রোচে না। এমন কি তোমার হাতের রান্নাও নাকি ফৌজীর পছন্দ নয়!’
হা হা করে হেসে উঠলেন উনি।

-‘মতিবিবি আমাকে পরামর্শ দিয়েছিল আপনার জন্য দোকান থেকে খাবার কিনে আনতে, কারণ আপনি আমার তৈরী খাবার একেবারেই খেতে পারেন না!’ আমার উত্তর।
আবারও উচ্চস্বরে হেসে উঠলেন উনি।
-‘বৌ মা, কি বিপদেই যে ফেললে আমাকে! এবার আমারই আক্ষেপ করতে ইচ্ছে করছে!’
আমি বললাম,’ চিন্তা করবেন না, বেশি ঝামেলা করলে রিটায়ার করিয়ে দেবেন।’

ভোজসভা বেশ হালকা হয়ে এসেছে।
চোখের কোণে ধরা পড়লো ছোট খাটো একটা জটলা।
ফৌজি, মতিন ও নীলাম্বু কি যেন পরামর্শ করছে, আর মুখ গোমড়া করে মৃধা ওদের কাছেই দাঁড়িয়ে আছে। তাড়াতাড়ি ওদের কাছে এগিয়ে গেলাম।
অনেক হয়েছে! এই বুড়ো হাঁড় আর কোনো নতুন সমস্যার ধকল সইতে পারবে না বলেই মনে হচ্ছে।
-‘মৃধা তুমি মুখ গোমড়া করে আছ কেনো? ওরা কি ফন্দি আঁটছে?’
-‘দেখ আপুমনি তোমার ভাইয়ের কি রকম অপমান! ওস্তাদ বলছে, আমাকে দলে নেবে না!
ওস্তাদের সাথে কত শত নির্ঘুম রাত ….আকাশের সাতটা তারা বার বার গুণে সারা রাত পার করেছি! আমি জানতাম ওখানে সাতটা তারা, তারপরও ওস্তাদ বলেছে ছয় , আমিও বলেছি ছয় ! এভাবেই সারা রাত! আর এখন আমাকে দলে নিচ্ছে না!’
বড় একটা দীর্ঘশ্বাস মৃধার বুক ফেটে বেরিয়ে এলো।
মৃধার দুঃখে আমারও চোখ ছলো ছলো হয়ে উঠেছে। ঝাঁপিয়ে এগিয়ে গেলাম জটলার দিকে । ফৌজীর নিচু স্বরে ষড়যন্ত্র মার্কা কথা শুনতে পাচ্ছি।
-‘তাহলে ওই কথাই রইলো। আগামিকাল ঠিক সন্ধ্যে সাতটায় তোমরা আসছ। পানি আমি জোগাড় করে রাখবো আর ক্যাটালিস্টের জন্য তো দোউখানু আছেই … আহ! অনেক দিন পর! জমবে ভালো! নীলাম্বু ,তুমি তোমার ব্র‍্যান্ডটা বলে দাও আমাকে আর মতিনের পছন্দ আমি জানি ।
আমার স্ত্রী আজকাল বেশ পাষাণী হয়ে উঠেছে! কখন যে প্রিয় বান্ধবী থেকে স্ত্রী হয়ে গেল.…!! ‘

-‘ যেদিন তুমি মধ্য পঞ্চাশ পার করলে, আর দু ঢোক গিলেই টুপ করে হাঁটু ভেঙ্গে ধরণী স্পর্শ করলে ঠিক সেদিন থেকেই…’

-‘অহ! শুনে ফেলেছো! ভালোই হলো, তোমাকেই তো সব জোগাড় যন্ত্র করতে হবে…’

-‘এখনই তো বললে দোউখানু তোমাদের সহযোগিতা করবে!’

-‘তোমার অনুমতি ছাড়া কি দোউখানু সহযোগিতা করবে!’

-‘ঠিক আছে অনুমতি দিলাম না হয়, কিন্তু মৃধাকে দলে নিচ্ছ না কেন?’

-‘শামীম অনুমতি দেবে না তাই … ‘
-‘আগে কি কখনও দিয়েছিল অনুমতি? আর মৃধা ছাড়া আসর জমে নাকি!’
-‘মৃধা চোখ মোছো, তুমি দলে আছো! কিন্তু জন গোমেজ বাদ গেলো কেনো!’

-‘তোমার জন্য সহধর্মিণী! জনকে দেখলেই তোমার মস্তিস্কের ভিতরের পিচ্ছিল পদার্থগুলো আরও পিচ্ছিল হয়ে ওঠে! বেচারী জন!’

-‘অ, তা তুমি যে বিলকিস বেগমের দিকে তাকিয়ে দিন পার করে দাও তার কি হবে!
ঠিক আছে জন বাদ, তাছাড়া এতগুলো বেহেডকে সামলানো বেশ কষ্টকর হয়ে যাবে।’
পাশ থেকে পরী মণ্ত্রির কথা শুনতে পেলাম।
-‘ভাবছেন কেনো? প্রয়োজন পড়লে আমাকে ডাকবেন। আমি হাত বাড়িয়েই আছি। আমরা তো এখন বন্ধু তাই না?’

-‘
প্লাবন,কোহেকাফ,আবিদ আর মৃধা পত্নী কখন যে কাছে এসে দাঁড়িয়েছে টের পাইনি।
উশখুশ করে প্লাবন বলে উঠলো, ‘কাল তাহলে আমাকে তাড়াতাড়ি কাজ থেকে ফিরে আসতে হবে।’

Sponsored Ads 

-‘না প্লাবন, তোমার না আসলেও চলবে কারণ কোহেকাফ আগামিকালের আসরে আমণ্ত্রিত নয়।’
ফোউজীর চাঁচাছোলা উত্তর । –‘আর এখানে মহিলারা এ্যালাউড নয়! তোমার ভাবিকে তো বাড়ি থেকে বের করে দিতে পারি না, তাই উনি থাকবেন।’

কোহেকাফের মৃদু গলা শুনতে পেলাম, ‘আমিও না হয় আসতাম এই আসরে।’

-‘না জনাব কোহেকাফ, আগামিকাল আপনারা ঢাকা শহর ঘুরে দেখুন।’

-‘হ্যাঁ কোহেকাফ আপনারা আগামিকাল শহরটা ঘুরে দেখুন । এদিকে দোউখানুর আসার সময় হয়ে গেলো.… আসছে না কেনো!’ আবিদের তড়িঘড়ি উত্তর।
অর্থাৎ এখন কোহেকাফের বিদায় আর দোউখানুর প্রত্যাবর্তন প্রয়োজন।
বিদায় নিতে নিতেও পরী বিষয়ক মণ্ত্রি বলে উঠলেন, ‘কাল প্রয়োজন পড়লেই ডাকবেন। আমি চলে আসব।যত রাত হোক দ্বিধা করবেন না!’
মৃধার চোখ ঘোরালো হয়ে উঠেছে!
-‘আপনাকে ডাকলেই চলে আসবেন? তা যত রাত হোক না কেন! কোথায় থাকেন আপনারা?’
-‘আমরা কোহেকাফ থেকে।’ কোহেকাফের উত্তর।
আবারও সামলে নিলেন পরী মণ্ত্রি ।
-‘আসলে কোহেকাফ সাহেব তার দেশের নাম বলছেন, আমরা উঠেছি…’
-‘রিজেন্সি হোটেলে, এখান থেকে বেশ কাছেই…’
আবিদের চটপট উত্তর।
-‘ওহ!’ মৃধার সন্দেহ কাটছে না এখনও।
কোহেকাফবাসীদের বিদায় দিয়ে একটু নিশ্চিন্ত বোধ করলাম। প্লাবন আর শামীমকেও বিদায় দিয়েছি।
সদর ঘন্টির শব্দে বুঝলাম দোউখানু চলে এসেছে ।
ফৌজী পড়ি মরি করে দৌঁড়ে গেল দরজা খুলে দেওয়ার জন্য।
-‘দোউখানু, তুমি চলে এসেছো? যাও, অনেক কাজ পড়ে রয়েছে। আগামিকাল আবার বিকেল থেকেই ভারি ডিউটি হবে তোমার!’
খাঁটি পদ্ম মধু ঝরে পড়লো ফৌজির গলা থেকে।

-‘জ্বি ষাঁড়! আপনি যা হকুম করবেন তাই হবে।’
-‘ষাঁড় কাকে বলছো তুমি! স্যার বল!’
মৃধা তেড়ে উঠলো।

-‘ঠিক আছে ষাঁড়।এখন থেকে ষাঁড় বলব।’
মুখে ফিচেল হাসি নিয়ে দোউখানুর বিনয়ী জবাব।

আবারও গরগর করে উঠলো মৃধা।
-‘ওস্তাদ, এই লোকটার দেশ কি রাজশাহী নাকি? স্যারকে ষাঁড় বলছে!’
ফৌজী টের পেয়ে গেছে ব্যাপারটা। কোহেকাফকে দলে না নেওয়ার কারণে দোউখানু প্রতিশোধ নিচ্ছে।
আবারও চিনি ঝরা গলায় ফৌজী জবাব দিল, ‘না, ওই মতিবিবির প্রভাব!’

মৃধার রাগের পারদকাটা কিছুতেই নামানো যাচ্ছে না।
আবারও গরগরে গলায় বলে উঠলো, ‘ওস্তাদ আপনি কিছুই বলছেন না! এই বেয়াদপি সহ্য করছেন কি করে?!’

-‘দোউখানু, তুমি তোমার ভাষা শুধরাও! এই ধরণের ভাষা ব্যবহার করলে আমি বিলকিস বেগমকে আমার ঘরে নিয়ে চলে আসবো!’

মাত্রাছাড়া আপত্তিকর কথা বলে ফেলেছে ফৌজী! আর চুপ করে থাকা যায় না!
-‘ঘরটা আমারও ফৌজি! তুমি ওখানে বিলকিস বেগমকে নিয়ে যেতে পার না!’
-‘ঘরের অর্ধেক আমার!’
ফৌজীর একগুঁয়ে উত্তর।

-‘ ঠিক আছে, আজ তাহলে ভাগাভাগি হয়েই যাক!
ঘরের দেয়ালগুলো আমার আর পূর্ব জানালার আশে পাশের জায়্গাটা।’
আমার নিরুত্তাপ উত্তর।

-‘তা কি করে হয়!’
সমস্বরে প্রতিবাদের ঝড় উঠলো।
-‘তা হলে বিলকিস বেগম থাকবেন কোথায়?’

-‘সেটা আমার বিবেচ্য নয়!’
-‘ঠিক আছে ভাগাভাগি নয় । বিলকিস বেগম যেখানে আছেন, সেখানেই থাকুক।’

সন্তুষ্ট চিত্তে দোউখানু নিজের কাজে চলে গিয়েছে।
এবার বাকিগুলোকে তাড়া দিলাম বিদায় হওয়ার জন্য।
যেতে যেতে নীলাম্বু বলে গেল, ‘ফৌজী ভাই, বিলকিস বেগমের ডাইনিং হলে থাকাই ভালো। আমি তো আর আপনার শোবার ঘরে গিয়ে বিলকিস বেগমকে দেখতে পারব না!
বাকিরা একবাক্যে সায় দিল আর আবিদ বলল, ‘কি পেয়েছে ওরা বিলকিস বেগমের মধ্যে ! খুঁজে দেখতে হবে তো!

সকাল থেকেই ফৌজির ব্যাস্ততা শুরু হয়ে গিয়েছে। কখন যে দোউখানুকে হাত করে ফেলেছে টের পাইনি।
ফৌজীর গোপন কুঠুরী হাতরে কয়েকটা রঙিন পানির বোতল দেখতে পেলাম।রসুইখানায় তৈরী হচ্ছে কোহেকাফি সুধা রস ।
বাধ্য হয়ে আমি আর আবিদ বাইরে খেতে চলে এসেছি। মতিবিবির অভাব অনুভব করছি!

ঠিক পাঁচটায় বাড়ি ফিরে এলাম আমি আর আবিদ।
খাবারের সুগন্ধে চারিদিকে ম ম করছে। আমাদের দু’জনের চোখে জল চলে এসেছে! বাড়িতে এত খাবার আর আমাদের গাঁটের পয়্সা খরচ করে বাইরে থেকে খেয়ে আসতে হল!
রসুইখানার দিকে এগিয়ে গেলাম আমরা। থরে থরে খাবার সাজানো আর দোউখানু এঘর ওঘর কাজ করে বেড়াচ্ছে, তবে উড়ে উড়ে; যেন শূন্যে সাঁতার কাটছে!
ফৌজীর দেখা পেলাম না।
-‘মা, গোপন কুঠুরীটা একবার খুলে দেখা দরকার।’
খুব নিচু স্বরে আবিদ বলল।
মাথা নেড়ে সায় দিয়ে গোপন কুঠুরীর দিকে ছুটে গেলাম আমরা।
কুঠুরীতে রঙিন বোতলগুলোর হিসেবে কোনো গরমিল নেই!
বাধ্য হয়ে দোউখানুকে ডাকলাম । উড়ে চলে এল দোউখানু, অবশ্য মাটিতে পা ফেলেই এক পাক রাজস্থানী নাচ নেচে নিল আগে।
-‘দোউখানু, বোতলের হিসেব ঠিক থাকলো কি করে? অন্তত দেড় বোতল শেষ করছো তুমি!’

-‘ম্যাডাম আপনার হিসেব একদম পাকা! বাকি আধা বোতলে পানি মিশিয়ে দিয়েছি , রঙটা ফিকে দেখাচ্ছে দেখে খাঁটি জাফরান মিলিয়ে দিয়েছি।’

-‘কিন্তু বোতলগুলো সিল্ড থাকলো কি করে?’

-‘ওটা আর কি এমন কঠিন কাজ! এ কাজতো বাংলাদেশের ব্যাবসায়ীদের বাঁ হাতের কাজ! গতকাল একটা ওয়্যার হাউজের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এক নজর দেখে নিয়েছিলাম। বোতলগুলো আমি আবার সিল করে দিয়েছি। আর ওনারা তো খাবেন আমার তৈরী কোহেকাফি সুধা।’

-‘দোউখানু ভাই,আমি তোমার কাছ থেকে এই ধরণের আচরণ আশা করিনি!’ আবিদের ব্যাথিত গলা।

দোউখানু যেন লজ্জ্বা পেলো।
-‘আআর হবে না আবিদ ভাই! আমি আরও একটা অপরাধ করেছি… আমি আপনাদের দুপুরে কিছুই খেতে দেই নাই…’

দোউখানু হাত পা ছড়িয়ে কাঁদছে …
বুঝলাম পানীয়র ফল!
-‘ঠিক আছে,ঠিক আছে, রাতের খাবার দিও, তাহলেই হবে। তবে অতিথিরা আসলে এভাবে উড়ে বেড়িও না। এখন যাও কাজ কর গিয়ে!’
আপদটাকে চোখের সামনে থেকে বিদায় করতে পারলেই বাঁচি এখন!

যেতে যেতে মাঝ পথে আবারও ফিরে এলো দোউখানু।
-‘আপুমনি ম্যাডাম,আমি আজ উত্তরা গিয়েছিলাম। ফৌজী স্যার বাজার করতে পাঠেয়েছিলেন। উত্তরায় আমি একজনের সাথে দেখা করে এসেছি…’
আমতা আমতা করে বলল দোউখানু।
-‘অ! বাজারেও পাঠানো হয়ে গিয়েছে! তা কার সাথে দেখা করলে?’
দুঃখ হচ্ছে, অসম্ভব দুঃখে হচ্ছে! তিরিশ বছরে কোনো দিন বাজারের নাম শুনিনি ফৌজির মুখে!
-‘জেসিনা ফারহান ম্যাডাম ল্যান্ড লাইন ফোনে কল করেছিলেন। আপনি তখন ঘুমাচ্ছিলেন। উত্তরা যাওয়ার পথে হঠাৎ মনে হল একটু দেখা করে যাই ওনার সাথে।
এবার আমার দুঃখ ছেড়ে বিলাপ করতে ইচ্ছে হল! না জানি কি অঘটন ঘটিয়ে এসেছে!
আমাদের এত দিনের বন্ধুত্ব বুঝি গেলো এবার!

-‘আম্মু! আল্লাহ জানে কি করে এসেছে! তারপর আবার যে হারে টেনেছে!’
খুবই ভীত শোনালো আবিদের কণ্ঠ।
-‘না না সন্দেশ আম্মু, ভয় পাবেন না। আমি সদর ঘন্টি বাজাতেই উনি দরজা খুলে দিলেন। আমি বললাম – আমি দোউখানু।’
-‘তারপর?’
-‘উনি এক গাল হেসে আমাকে বসার ঘরে নিয়ে গেলেন তারপর ব্রোকেন গ্লাস পুডিং খেতে দিলেন। ব্রোকেন গ্লাস পুডিংটা ছোট ছোট চুরচুরে রঙিন কাচের গুড়োর মত ছিল।আমি চানাচুরের মত কুড়মুড়িয়ে খেয়ে ফেললাম। অতি সুস্বাদু! তারপর হঠাৎ ফৌজী স্যারের কথা মনে পড়ল, আমি বিদায় নিয়ে চলে আসলাম । ‘ হাপ ছেড়ে বাঁচলাম আমরা দুজন।
ফৌজীর সাড়া পাচ্ছি। আমাকে দেখেই হৈ চৈ করে উঠলো।
-‘প্রিয়ংবদা,বসার ঘরে এস, দেখ বসার ঘরটা কি সুন্দর করে সাজিয়েছি!’
আবিদ বলল, ‘বাবা বোধ হয় কোহেকাফি সুধাগুলো একটু একটু করে চেখে দেখেছে!’

-‘হু …, প্রিয়ংবদা যখন বলছে… তাই হবে বোধ হয়!

আবিদ বলল, ‘সুধার কল্যাণে মিঠে কথা শুনছো … এটাই বা কম কি!’

ফৌজীর হাঁক ডাকে বসার ঘরে যেতে বাধ্য হলাম।
নেই!ওখানে কিছুই নেই!
ঘর থেকে সব আসবাব ঝেঁটিয়ে বিদায় করা হয়েছে, এমনকি ওয়াল ডেকরাশনগুলো পর্যন্ত! একটা দেয়ালে জুড়ে শুধু বিলকিস বেগম । দুটো কার্পেট পাতা। একটা একদম খালি আর একটাতে শাহী কায়্দায় অতিথিদের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ছোট বড় নানা ধরণের ঝকমকে তাকিয়া আর নিচু কয়েকটা টেবিল। অদৃশ্য কোনো যায়্গা থেকে বেহালার অজানা করুণ সুর ভেসে আসছে।
করুণ সুরটাই শুধু পছন্দ হল! দোউখানু খানা ও পিনার ব্যাবস্থায় লেগে পড়েছে। চোখের জল চেপে বেরিয়ে এলাম। আবিদ বলল,’কেঁদো না মা! সব ঠিক হয়ে যাবে!’
আবিদ নিজের ঘরে চলে গিয়েছে আর আমি বারান্দায় বসে নিজের মনে তারাগুলোর সাথে আলাপ জুড়েছি! আর কি বা করার আছে আমার! সামরিক শাসনের উপর কোনো কথা চলে না! তারপর ওদের আছে দোউখানু নামের মহা শক্তি!

বেগুনি তারাটার সাথে কথার পালা তখনও শেষ হয়নি, মনে পড়ল আবিদের কথা। আবিদ খেলো কিনা দেখতে হবে।

দোউখানু রসুইখানায় নাচছে আর কাজ করছে।
দোউখানুকে দিয়ে আবিদের ঘরে খাবার পাঠিয়ে দিলাম।
বসার ঘরে কি হচ্ছে দেখার কৌতুহলটা দমন না করতে পেরে ঢুকেই পড়লাম ওখানে।
একি! রবীন্দ্রনাথের বর্ষা পর্বও যে হার মেনেছে! কুড়িগ্রামের বান কি এখানেও আঘাত হানলো!

নীলাম্বু অঝোর ধারায় কেঁদে চলেছে!
বাকি তিন জনও কাঁদছে!
দোউখানু সবার গেলাসে জল ঢালছে, মাঝে মাঝে দুই এক ঢোক খাচ্ছে আর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে উঠেছে!
বাধ্য হয়ে গালিচার এক কোণে গিয়ে বসলাম।
-‘নীলাম্বু ভাই,তুমি কাঁদছো কেনো?’
বুক ভাঙ্গা কান্নার তোড়ে নীলাম্বু কথাই বলতে পারছে না।ইশারা করছে মতিনের দিকে!
মতিনের দিকে তাকিয়ে আছি উত্তরের আশায়।
-‘নিলাম্বু ভাই কাঁদছেন কারণ প্লাবন আজ সকালেই ঘোষণা করেছে যে সে আমাকে বিয়ে করবে তবে উনি প্লাবনের বিয়ে নিয়ে চিন্তিত নন। প্লাবনকে বিয়ে করার পর আমার দুরবস্থার কথা ভেবেই উনি কাঁদছেন!’
-‘বুঝলাম, কিন্তু আপনি কাঁদছেন কেন!’
-‘আমি কাঁদছি নীলাম্বু ভাইয়ের কথা ভেবে। প্লাবন নামের অসুখের তো কোনো ওষুধ নেই! কাটা ঘায়ের উপর লবনের ছিটার মত প্লাবন নামের যন্ত্রনা নীলাম্বু ভাই কে আমৃত্যু সহ্য করতে হবে! আহা! কি কষ্ট! কি কষ্ট!’
-‘ঠিক আছে আপনারা কাঁদুন! মৃধা, তুমি কাঁদছো কেনো?’

শ্রাবণের ভারী মেঘ দু’চোখে নিয়ে অপরাধীর দৃষ্টিতে ফোউজীর দিকে একবার তাকালো তারপর বলল,’ ওস্তাদের কাছে আমি অপরাধী!’
-‘কি এমন অপরাধ করেছো মৃধা?’
ভাইয়ের দুঃখ আমার প্রাণে শেলের মত বিঁধছে যেনো!
-‘আজ থেকে তিরিশ বছর আগে আমি আমার বোন মানে আপনার সাথে ওস্তাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলাম! আহা! কি ভুলই না করেছিলাম! ওস্তাদের জীবন যৌবন বন্দীশালাতেই কেটে গেলো!’
-‘অ! আমি ফোউজীর কান্নার কারণ জানতে চাই!’
ভেঙ্গে পড়া গলায় ফৌজী বলল,’প্লাবনের কথা ভেবে আমি কাঁদছি! আজকে খেলাম বলেই না নীলাম্বু আর মতিনের মনের কথা জানতে পারলাম! আহাহাহা … আমি আমার বোনের বিয়ে দেব কি করে! সবাই ওকে ভয় পায়! আহা! আমার বোনটা তো না ঘরকা না ঘাটকা হয়ে গেল!’

বাক শক্তি হারানোর পথে আমার! ফৌজীর মনের কথা জানতে পেরে আমার যে দিকে দু চোখ যায় সেই দিকে চলে যেতে ইচ্ছে করছে।
অনেক কষ্টে দোউখানুকে প্রশ্ন করলাম।
-‘স্যারেরা তো আসল কথাটা বলছেন না! একটু আগেই ওনারা বিলকিস বেগমকে নিয়ে ঝগড়া করছিলেন! সবাই একই কথা বলছেন,’ বিলকিস বেগম আমার!’
আমি বললাম, ‘বিলকিস বেগম আমার, কারণ আমি সন্দেশজাদীর বংশধর!’ দোউখানুকে আরেক দফা ড্রিংক সার্ভ করতে বলে বেরিয়ে এলাম।
যাই,বেগুনি তারাটা আমাকে টানছে!

চলবে ……………সবগুলো পর্ব এখানে পাওয়া যাবে    

ম্যাগাজিন এ লিখতে  এখানে রেজিস্ট্রেশন করুন   

আরো গল্প  পড়তে  এখানে ক্লিক করুন 

Sponsored Ads

লাইক করুন , কমেন্ট করুন এবং শেয়ার করুন ।

Facebook Comments

2019-02-12T09:27:53+00:00

About the Author:

Leave A Comment

Shares