” ঘড়া ” একটি জ্বীন এর গল্প ( পর্ব ১১ )

/” ঘড়া ” একটি জ্বীন এর গল্প ( পর্ব ১১ )

” ঘড়া ” একটি জ্বীন এর গল্প ( পর্ব ১১ )

দোউখানুকে আরেক দফা ড্রিংকস সার্ভ করতে বলে,অতলান্তিকের সমান পরিমান দুঃখ নিয়ে বেরিয়ে এলাম। সবাই বলছে, বিলকিস বেগম আমার ! তা বলুক, কিন্তু ফৌজি বলবে কেন ! কাজ নেই আর দ্বিতীয় নৈশভোজের আয়োজনে !
আগামিকাল সকালে আমার আর সুলতানা আব্রাহামের অবস্থান অদল বদলের পালা শুরু হওয়ার কথা ছিল- এই মাঝরাতেই মানা করে দিলাম সুলতানাকে। অজুহাত হিসেবে জানালাম যে মণ্ত্রিত্ব সামলানো আমার সাধ্যের বাইরে। ভোর রাতে ঝুল বারান্দাটাতে গিয়ে বসতেই চোখে পড়ল নীলচে বেগুন রঙা তারাটা।পূব আকাশে এখনও জ্বলজ্বল করছে। সুরেলা একটা কণ্ঠ যেন বলে উঠলো, মন খারাপ? এসো গল্প করি। অবাক হয়ে বেগুনি তারাটাকে প্রশ্ন করলাম, তুমি কথা বলছ?
-হু।
-আমার মন ভালো নেই তারা !
-আহা, সেই জন্যই তো তোমার সাথে গল্প করতে চাইছি । আমার নিযুত বছরের গল্প শুনলে, তোমার মন ঠিক ভালো হয়ে যাবে।
ও আমাকে শোনাল ওর একটা গ্রহের কথা-যেখানে জলাগুলো প্যাপিরাস বনে ঢাকা।ঝাঁকে ঝাঁকে হাঁসেদের বাস ওখানে।প্যাপিরাসের আড়ালে চলে ওদের মন দেওয়া নেওয়ার পালা।
ভোর হয়ে আসছে দেখে তারা বলল,আজ এ পর্যন্তই থাক,কাল তোমাকে আমার আরেকটা গ্রহের কথা শোনাব, যেখানে মানুষের বাস। মাথা নেড়ে সায় দিয়ে ঘরে ফিরে এলাম। আবার একটা নতুন দিনের শুরু। দিনটা নামেই নতুন ; আসলে সব কিছুই গতকালের মত, শুধু ভাঙা মনটা ছাড়া। ‘প্যাপিরাসের আড়ালে চলে ওদের মন দেওয়া নেওয়ার পালা ‘ -কথাটা বার বার ঘুরে ফিরে কানে বাজছে … । আর আমি একত্রিশ বছরেও ফৌজির মন পেলাম না !
চোখে টইটুম্বুর জল নিয়ে ঘরে এক কোণে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছি। সম্বিত ফিরল সমস্বরে ‘মা’ ডাক শুনে। ঘরের দরজায় আবিদ আর দোউখানু দাঁড়ানো।
-দোউখানু আমি তোমার মা নই ! আমি শুধু আবিদের মা, আর কেউ নেই আমার ! কণ্ঠে অভিমানের সুর ফুঁটে উঠতে দেখে নিজেই অবাক হলাম। অভিমান তো মানুষ প্রিয়জনের উপর করে। কত দিনের পরিচয় আমার দৌখানুর সাথে? সপ্তাহও বোধ হয় পার করে উঠতে পারি নি ! না, না, আর মায়ায় জড়াবো না !
-মা, তুমি মিছে রাগ করছ দৌখানুর উপর ! ও আমার অনুমতি নিয়ে তোমাকে ‘মা’ ডেকেছে। দৌখানু হাত জোর করে দাঁড়িয়ে রয়েছে, আর আবিদ বলল, বাবাকে মাফ করে দাও মা !
সজোরে মাথা নেড়ে ‘না’ জানালাম।
-আমাকে মাফ করে দিন মা ! কথা গুলো আপনাকে জানানো ঠিক হয় নি ! আসলে শাহজাদী বিলকিসকে নিয়ে সবাই টানা টানি করছে দেখে আমার মাথা কাজ করছিল না ! অভিমানে আপনার কাছে অভিযোগ করে ফেলেছিলাম !
-দোউখানু, তুমি যদি আমাকে না জানাতে, তাহলে তো আমি সারা জীবন অন্ধকারেই রয়ে যেতাম। অন্তত বাকি জীবনের জন্য তো আর প্রতারিত হব না ! তুমি কোনো দোষ কর নি দোউখানু !
-মা, কোহেকাফি সুধা গুলো একটু বেশি রকমের খাঁটি ছিল। তাছাড়া, ওনারা এই পানীয়তে অভ্যস্থ নন। ফৌজী স্যার একটু বেতাল হয়ে পরেছিলেন। বেতাল অবস্থায় কি বলতে কি বলেছেন … আমারই দোষ মা !
-দোউখানু, তুমি নিশ্চয় জানো- মাতাল মিথ্যে বলে না!
-মা,তুমিও খুব ভালো করেই জানো, বাবা কখনও বেতাল হন না, মাতাল হওয়া তো দূরের কথা! উনি শুধু সবার সুরে সুর মিলিয়েছিলেন…
একটু থেমে আবিদ আবারও বলতে শুরু করল, বাবাকে তুমি খুব ভাল করেই চেনো মা। বাবা যদি কিছু লুকাতে চান অথবা না বলতে চান, তাহলে তাঁকে ছয়্তলার উপর থেকে ফেলে দেওয়ার হুমকি দিলেও উনি সত্যি জানাবেন না।আর মা, বিলকিস বেগমের প্রতি মোহ, ওটা ওনার একটা খেলা মাত্র। তোমার সাথে খুনশুটি বলতে পার। তুমি যখন ঘর থেকে বের হয়ে চলে গেলে, বাবা তখনই বুঝে ফেলেছিলে ব্যাপারটা। তোমার পিছু পিছু উঠেও এসেছিলেন, কিন্তু তুমি ঝুল বারান্দায় পৌঁছে দরজাটা বন্ধ করে দেওয়াতে বাবা তোমার কাছে যেতে পারে নি। গেলেও কোনো লাভ হত বলে মনে হয় না !
মনে হল,বড় বেশি বড় হয়ে গিয়েছে আমার ছোট্ট ছেলেটা।
-তুমি জানলে কি করে আবিদ?
-আমি বাবাকে তোমার পিছু পিছু যেতে দেখেছি । পরে দোউখানু আর বাবা আমাকে সব জানায়। সংগে সংগে উনি অতিথিদের বিদায় নিতে অনুরোধ জানান। ওনারা তখনই চলে গিয়েছিলেন। বাবা ঝুল বারান্দার দরজাটা বন্ধ হতে দেখে খুব ভয় পেয়েছিলেন।
-স্যার আমাকে আপনার ঝুল বারান্দার রেলিঙের উপর অদৃশ্য হয়ে বসে থাকার আদেশ দেন।আমি সেই মাঝ রাত থেকে রেলিঙের উপর বসে ছিলাম । এখন পা ব্যাথা করছে! আপনি একা একাই কথা বলে যাচ্ছিলেন । আপনি ঘরে চলে আসাতে আমি ফিরে এসেছি।
রাগে জ্বলে উঠলাম আমি।

Sponsored Ads 

 

– তোমার পা ব্যাথার জন্য আমি দায়ী না! কেন গিয়েছিলে ওখানে? আমার কি ব্যক্তিস্বাধীনতা বলে কিছুই নেই ! আমার কথা গুলোও তুমি শুনেছ নিশ্চয়?
-না মা, আপনাকে অনিষ্ট থেকে রক্ষা করার জন্য আদেশ দেওয়া হয়েছিল আমাকে। মা,আমি আপনাকে সম্মান করি, ভালোবাসি। আপনার ব্যাক্তিগত কথা শোনার মত ধৃষ্টতা আমার কখনই হবে না ! স্যারকে মাফ করে দিন মা।
আবারও সজোরে মাথা ঝাঁকালাম -না।
ওদের দিক থেকে মাথা ঘুরিয়ে নিয়েছি। অর্থাৎ,আমি আর কথা বলতে চাইছি না।
বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল ওরা । তারপর আবারও আবিদের গলা শুনতে পেলাম,ঠিক আছে মা,আমরা চলে যাচ্ছি।শুধু মাত্র আর কয়েকটা কথা কথা… বাবা বিলকিস বেগমের ছবিটা দেয়াল থেকে নামিয়ে ফেলেছে পেইন্টিংটা আজই এবং এখনই মামার বাড়িতে পৌঁছে দেবে। বাবা তৈরী হয়ে ষ্টাডিতেই বসে রয়েছেন , কিন্তু কেন জানি একের পর এক গান গেয়ে চলেছেন। বাবার গান অনেক দিন পর শুনলাম… শেষ শুনেছিলাম দাদুর ইন্তেকালের ঠিক পর পর। অদ্ভুত প্রাণে ছোঁয়া গান…মনে হচ্ছে যেন প্রার্থনা করছেন।
আমি জানি ফৌজী খুব সুন্দর গান গায়, তবে দুঃখে, অনুতাপে,কষ্টে।
জীবনে ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে আবার।ভরাট গলার ওই গান গুলো শুনতে ইচ্ছে করছে।
আবিদ আর দৌখানু চলে গিয়েছে। মতি বিবি একটু পরেই চলে আসবে। কোমরের ব্যাথা বেশ কমেছে ওর। রাজত্ব দখলের ভয়ে তাড়াতাড়ি চলে আসতে চাইছে। যাই মতিবিবি আমার আগেই ফোউজীর গান একটু চুপি চুপি শুনে আসি,তবে ক্ষমা ওকে আমি করব না ! দিন শেষে আবারও ফিরে যাব বেগুনি তারাটার কাছে।আজ শুনব যে গ্রহে মানুষের বাস তাদের কথা।

সবগুলো পর্ব এখানে পাওয়া যাবে    

ম্যাগাজিন এ লিখতে  এখানে রেজিস্ট্রেশন করুন   

আরো গল্প  পড়তে  এখানে ক্লিক করুন 

Sponsored Ads

লাইক করুন , কমেন্ট করুন এবং শেয়ার করুন ।

Facebook Comments

2019-02-12T09:36:34+00:00

About the Author:

Leave A Comment

Shares