” ঘড়া ” একটি জ্বীন এর গল্প ( পর্ব ৭ )

/” ঘড়া ” একটি জ্বীন এর গল্প ( পর্ব ৭ )

” ঘড়া ” একটি জ্বীন এর গল্প ( পর্ব ৭ )

দোউখানুর মাধ্যমে কোহেকাফের বাবুর্চি সম্প্রদায়কে মূল্য পরিশোধ করে বেশ নিশ্চিন্ত বোধ করছি। নিজের ঘরে এসে নুরুন নাহার লিলিয়ানের একটা উপন্যাস খুলে বসেছি মাত্র, চোখের কোণায় ধরা পড়ল মানিক জোড়ের উপস্থিতি । চমকে তাকালাম ওদের দিকে । ভয়ে ভয়ে চোখে একটা প্রশ্নবোধক নিয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে আছি।
-‘আম্মু, দোউখানু ভাই একটা আর্জি নিয়ে এসেছে।’
-‘আর তুমি ওর হয়ে তরফদারি করতে এসেছো? তোমার আর কোনো কাজ নেই?’
-‘নাহ, সামনের এক মাস আমার কোনো কাজ নেই।’
-‘ওহ! তা কোনো মেয়ে বন্ধুর সাথে গল্প করলে কেমন হয়?’
-‘না, আমার মেয়ে বন্ধুরা সবাই পড়ুয়া টাইপ। ওদের সাথে কথা বলতে গেলে লেখা পড়ার কথা চলে আসে।’
-‘অ, তা কি বলবে বল! দোউখানুর আর্জিটা কি তুমি পেশ করবে?’
-‘জ্বি না ম্যাডাম, আমি বলব।’
-‘বল!’
-‘কোহেকাফে থাকা কালীন সময় আমার একজন শিক্ষানবিশ ছিল। বর্তমানে সে এখন কোহেকাফের পরী বিষয়ক মণ্ত্রির প্রধানা রাঁধুনী। আমার মুখে এত বড় নৈশ ভোজের কথা শুনে তার খুব ইচ্ছে হয়েছে এই ভোজে যোগদানের। আমি তাকে নিমন্ত্রণ জানাতে চাই। আপনার অনুমতি প্রয়োজন।
-‘প্রধানা? মানে সে একজন মহিলা? তার মানে পরী! আবিদ, তুমি কি একবারও ভেবে দেখেছো কি যে একজন পরী ডিনারে উপস্থিত থাকলে কি ধরনের বিপর্যয় ঘটে যেতে পারে?’
-‘জ্বি আম্মু জানি। আগত পুরুষ অতিথিদের সামলানো কঠিন হবে তোমার পক্ষে, তা ছাড়া আমি ও আমার বাবাও পুরুষ সম্প্রদায় ভুক্ত। ভদ্র মহিলাকে না করা যাচ্ছে না।’
-‘আমার মনে হয় তোমার একটু ভুল হল, কথাটা হবে – না করতে মন চাইছে না। দোউখানু ,পরী কি তোমার বোনের পর্যায়ে পড়ে? কারণ, তোমার সাথে মারামারিতে কেউ পেরে উঠবে না।পরী যদি তোমার বোন জাতীয় কেউ হয়, তাহলে আমার উত্তর -না।’
-‘না ঠিক বোনের পর্যায়ে নয়, তবে খুব অল্প পরিমানে প্রায় বোনের মত।’
-‘ওহ! খুব অল্প পরিমানে, তাহলে ডাকতে পার।’
-‘ধন্যবাদ ম্যাডাম, আমার তরফ থেকে আরও একজন অতিথি ছিলেন…’
-‘বল!’
-‘পরী বিষয়ক মণ্ত্রিও আসতে চান!’
-‘ইনিও কি অল্প বয়স্কা?’
-‘আনুপাতিক হারে উনি আপনার সমবয়স্কা হবেন। প্রায় বৃদ্ধা বললেই চলে।’
-‘প্রায় বৃদ্ধা! ঠিক আছে উনিও আমণ্ত্রিত হলেন!’
অত্যন্ত বিমর্ষ ভাবে আমি উত্তর দিলাম।
-‘যদি তোমাদের আর কোনো বক্তব্য না থাকে, তাহলে আমি একটু বিশ্রাম নিতে চাই। ‘প্রায় বৃদ্ধা’ হয়েছি তো!’
-‘দোউখানু! তুমি আমার মাকে বৃদ্ধা বলেছো! ‘
-‘আমাকে মাফ করবেন আবিদ ভাই!’ দোউখানুর মিনমিনে উত্তর।

মাত্র আধা ঘন্টার মধ্যেই অমকে জেগে উঠতে হল! মতিবিবির ফোন!
-‘মিডাম, আমার রান্নাঘর যে ওদিকে পুরে ছারখার হয়ে গেল! ওই দামড়া পাকু মিয়া যে কি করছে কে জানে! এদিকে আমি তো কোমর ব্যাথায় উইঠতে পারছি না!’
এক গাল হাঁসি নিয়ে উৎফুল্ল ভাবে উত্তর দিলাম, ‘না,না মতিবিবি, রান্নাঘর থেকে ফুলের বাগানের সুগন্ধ বের হচ্ছে! তুমি দু’দিন বিশ্রাম নাও!’
-‘কিন্তু দাওয়াতের কি হবে! আপনি বুড়ো মানুষ! আপনাকে আবার রান্নাঘরে যেতে হবে! বরং দোকান থেকে খাবার কিনে নিয়ে আসেন। একটু খরচ বেশি হবে আপনার, আর বড় বেগম সাহেবা মানে আপনার শাশুড়ী আম্মা তো আপনার রান্না খেতে পারেন না! ওদিকটাও তো দেখতে হবে আপনার!’
নাহ! মতিবিবিকে এবার রিটায়ারমেন্টে পাঠাতেই হচ্ছে। এই মতিবিবির মত মানুষের জন্যই শাশুড়ী আর বৌয়ের সম্পর্ক খারাপ হয়!
-‘তুমি ঠিক বলেছো মতিবিবি, আমি দোকান থেকেই খাবার নিয়ে আসব । তুমি নিশ্চিন্ত থাক। পাকু মিয়া তোমাকেও খাবার পৌঁছে দিয়ে আসবে।’
দাঁড়াও মতিবিবি! তোমাকে তোমার বড় বেগম সাহেবার কাছেই পাঠিয়ে দেব! ওনার এখন যত্ন আত্তির প্রয়োজন,পুরোনো লোক ছাড়া আর কে করবে যত্ন। তারপর দেখবো !

Sponsored Ads 

-‘আমি একটু নিশ্চিন্ত হলাম মিডাম । এখন তাহলে রাখি।’ ঘরের দরজায় ‘please,do not disturb.’ লাগিয়ে রেখে একটু বিশ্রামের চেষ্টা করছি। রাত নয়টা পর্যন্ত একটু ঘুমিয়ে নেই। রাতে আবার মানিক জোড়ের কীর্তি কলাপের অতন্দ্র প্রহরী হতে হবে।
এখন রাত দশটা,কিন্তু কারো সাড়া শব্দ পাচ্ছি না। প্রিয়তমের প্রত্যাবর্তনের সময় তো এক ঘন্টা আগেই পেরিয়েছে, আর মানিক জোড়ের কোনো সাড়া পাচ্ছি না কেন!
উদ্বিগ্ন হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। প্রথমেই চোখে পড়ল গৃহকর্তার একিনিষ্ঠ চক্ষু অনুশীলন। দোউখানু আর আবিদ রান্নাঘরে। সবাই যেন মহা ব্যাস্ত। রান্নাঘরে কি চলছে দেখার আগে গৃহকর্তার সাথে মোকাবিলাটা করে নেই।
-‘আমি ভেবেছিলাম তুমি এখনও অফিসে…’
-‘, না আগেই ফিরেছি,ঘরের দরজায় ‘do not disturb ‘ বোর্ড দেখে এখানে বসে রয়েছি।’
-‘ওহ! আমার একটা কথা বলার ছিল…’
উৎসুক দৃষ্টিতে ফিরে তাকিয়েছে ফৌজি। যাক! রোগটা তাহলে অতটা খারাপ না, এখনও আমার কথা শুনতে উৎসাহ বোধ করে!
-‘শাহজাদী বিলকিস বেগম ছিলেন দোউখানুর প্রেমিকা, তুমি যদি এভাবে শাহজাদীর দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাক, তাহলে দোউখানু মনে কষ্ট পেতে পারে।’
-‘ঠিক বলেছো! আমি বরংপালা ঠিক করে নেই…’
-‘একটু যদি বুঝিয়ে বলতে…’ -‘মানে যখন দোউখানু কাজে ব্যাস্ত থাকবে তখন নাহয় আমি…’
-‘ঠিক আছে এটুকুর অনুমোদন দেওয়া যেতে পারে…’
-‘অনুমোদন?! কিসের অনুমোদন? আমি তো তোমার চোখ দিয়ে দেখছি না; চোখ আমার, আর আমার চোখ স্বাধীন।’ নির্ভীক ফৌজির নির্ভীক জওয়াব !
-‘অহ! তাও ঠিক!’
প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে আবারও প্রশ্ন করলাম, ‘ তোমার বন্ধুরা সবাই আসবেন তো? রশিদ মৃধা,শফিকুল হায়্দার আসবেন তো তাই না?’
-‘আমার মনে হয় তুমি ভুল পথে আগাচ্ছো, রশিদ মৃধার চোখে তুমি ভগ্নীসমা আর শফিকুল হায়্দার এক সময় তোমার বস ছিলেন,সুতরাং অধিনস্থের সাথে কোনো রকম প্রগল্ভ আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়।’
-‘ঠিক। তাও ঠিক! জন… কি যেন নাম ওনার? ‘
-‘জন গোমেজ। মুস্কিলে ফেললে! সহজ সরল মানুষটাকে এসবের মধ্যে না টানলেই নয়?
প্রিয় বান্ধবী, কোথাও বেড়াতে যাই চল!’
-‘অন্য কোনো সময় বুড়ো ফৌজি! স্বাধীনতার সুখ ভোগের অধিকার সবারই আছে। তুমি বরং বিলকিস বেগমের দিকে মনোযোগ দাও।’
-‘ -‘মানবে না যখন, তখন আর সময় নষ্ট করে কি লাভ!’
-‘তুমি তোমার কাজ কর, আমি দেখি ওদিকে কি হচ্ছে।’
-‘আম্মু, দোউখানু ভাই স্টেইক বানাচ্ছে -তিন রকমের! দোউখানু ভাই জানতো না কি ভাবে স্টেক বানাতে হয়! আমি ইউ টিউবে ভিডিও দেখালাম, এখন ভিডিওর স্পিডে স্টেইক তৈরী হয়ে যাচ্ছে!’ -আবিদ তুমি বরং এক কাজ কর, একটা স্টেইক তোমার বাবাকে দিয়ে এসো। তাকিয়ে থাকতে থাকতে নিশ্চয় ওনার চোখ ব্যাথা করছে! একটু বিশ্রাম দরকার চোখের!’
-‘স্যারকে দেখতে দিন ম্যাডাম। আমি বুঝতে পারছি ওনার মনের যাতনা!
-‘অ,আমি তোমার কথা চিন্তা করেই বলেছিলাম! তা আবিদ, তোমার কোনো ব্যাথা বেদনা এই ব্যাপারে…’
-‘না মা, উনি ভিন্টেজ টাইপ, তবে নিঃসন্দেহে সুন্দরী।তবে ক্যারোলিনা কামার ইলতুতমিশকে বেশ ভালো লেগেছে ‘
-‘আমি চিনতে পারলাম না! এই মহিলা কি আমণ্ত্রিত?’
-‘ওহ, ইনি হলেন দোউখানুর শিক্ষানবিশ।’
-‘দেখেছো তাহলে ওনাকে!’
-‘হ্যাঁ, দোউখানু ভাই দেয়ালে প্রজেক্টর তৈরী করে দেখিয়েছে, কথাও বলেছি।’
-‘ভালো! বয়স কত?’
-‘আমার মতই হবে।’
-‘তাহলে তো তুমি যথেষ্ট।নিশ্চিন্ত হলাম।’
-‘অতটা নিশ্চিন্ত হওয়া ঠিক হবে না! আমি তো আর বড়দের সাথে বেয়াদপি করতে পারবো না!’
-‘ঠিক । তাও ঠিক! দোউখানু, আশা করি সব এ্যারেন্জমেন্ট সময় মত হয়ে যাবে?’
-‘আম্মু ম্যাডাম… দুঃখিত ম্যাডাম, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন!’ -‘আর একটা ব্যাপারে আপনার অনুমতি প্রয়োজন ম্যাডাম। আবিদ ভাই ক্যারোলিনার সাথে আর একবার কথা বলতে চায়।’

-‘অনুমতি দিলাম, যদিও আমার মন চাইছে না; তবে বৃহত্তর স্বার্থে অনুমতি দেওয়া প্রয়োজন! রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলাম।
-‘বিলকিস বেগম থেকে স্টেইক বেশি টানছে আমাকে, আগামিকাল অফিসে অনেক কাজ তারপর আবার দাওয়াতের ব্যাপারটাও আছে; কর্তব্য আগে । আমার পালা আজকের মত শেষ!’ আমি দোউখানুকে ডেকে বললাম, ‘দোউখানু অনেক ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়েছো, মঞ্চ এখন তোমার।’
আবিদের সমর্থন পেলাম।
-‘দোউখানু ভাই, তুমি মনোনিবেশ কর, রাতের খাবার আমি সার্ভ করছি আর তিন প্রকারের স্টেইকই তোমাকে দিচ্ছি। অনেক কষ্ট করেছো আজ।’
-‘সেই ভালো।’ সবার সাথে গলা মিলিয়ে ফৌজীও সমর্থন করলো। সব শেষে আমি আবারও বললাম, ‘ঠিক। তাও ঠিক!’
খাবার টেবিল থেকে উঠে যাওয়ার আগে দোউখানুকে বললাম, ‘দোউখানু, আশা করি পরী ক্যারোলিনা মনে রাখবেন যে উনি একজন পরী আর আমার ছেলে আবিদের জন্যও একই উপদেশ থাকলো। দোউখানুর জন্য উপদেশ যে দোউখানুকে মনে রাখতে হবে আমি সন্দেশজাদীর বংশধর।’

চলবে …………… সবগুলো পর্ব এখানে পাওয়া যাবে    

লাইক করুন , কমেন্ট করুন এবং শেয়ার করুন ।

 

Facebook Comments

2019-02-18T15:31:58+00:00

About the Author:

Leave A Comment

Shares